অবিচার [দ্বিতীয় পর্ব]

অবিচার [ দ্বিতীয় পর্ব ]

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক দিন:

বাসার সামনে বড় তালা ঝুলে আছে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল বাদলের। মোমেনা আবার তাকে না বলে কোথাও গেছে। কিন্তু কোথায় যেতে পারে, কখন আসবে, এসব কিছু বলে যায়নি। সেসব থাক, যাওয়ার আগে তাকে একটু বলে যাবে না? বাদলের খুব অপমানবোধ হতে থাকে।

মোমেনা আজকাল বেশিই অবাধ্য হয়ে গেছে। দিনদিন তার জীবনটা বিষিয়ে তুলছে। গলায় আটকানো মস্ত বড় কাঁটার মতো মনে হয় মোমেনাকে। না পারছে গিলে ফেলতে, না পারছে বের করে ফেলে দিতে। মোমেনা কোথায় গেছে জানতে পারলে ভালো হতো। এখন সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে, নাকি ছোট বউয়ের কাছে যাবে সেই সিদ্ধান্তও নিতে পারছে না।

ছোট বউ কোহিনুর খুবই গরিব ঘরের মেয়ে। মোমেনা যখন বাঁদলের জীবনটা নরক বানিয়ে ফেলেছে তখনই একদিন হুট করে কোহিনুরকে বিয়ে করে বাদল। শুধুমাত্র মানসিক প্রশান্তির জন্য। মা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন মোমেনাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে শান্তিতে রাখার চেষ্টা করতেন। মা মারা যাওয়ার পর মোমেনা যেন লাগামহীন ঘোড়া হয়ে গেছে। অবাধ্য, যাকে কিছুতেই বাগে আনা যায় না।

বাদল সরকারি পুলিশ কর্মকর্তা। পোস্টিং এর কারণে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। গ্রামের বাড়িতে মোমেনাকে নিজের বাপের ভিটার কাছেই জমি নিয়ে পাকা বাড়ি করে দিয়েছে। খাবার-দাবার, মাসিক বাজার সব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশিই পেত মোমেনা। তা দিয়ে সে কী করে বাদল জানতে চায়নি কখনোই। কিছু একটা জিজ্ঞেস করলেই সাপের মতো ফোঁস করে ওঠে। তাই তাকে খুব একটা ঘাটাত না বাদল।

বাদলের চাওয়া এতটুকুই, সপ্তাহান্তে বা মাসে যখনই আসে একটু যত্ন যেন সে পায়। একটু হাসিমুখে কথা বলা, একটু আদর-আপ্যায়ন করা, পছন্দ-অপছন্দের দিকে খেয়াল রাখা। নাহ্, এসব বাদল পায়নি কখনো। বাড়ি ফিরে যখন মোমেনার রণমূর্তি দেখত, কথায় কথায় চটাং চটাং জবাব শুনত, দপদপিয়ে হেঁটে বেড়ানো দেখত, তখন বাদলের ক্লান্তি কয়েক হাজার গুণ বেড়ে যেত। মনে হতো এসব ছেড়ে বনে গিয়ে সন্ন্যাসব্রত নিলেই অনেক শান্তি পাবে সে। তবু ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সব সহ্য করে যাচ্ছিল সে। কিন্তু যখন তার আদরের বড় কন্যা মায়ের পথ অনুসরণ করল তখন বাদলের নিজেকে সামলিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ল।

মোমেনার ওপর প্রতিশোধ নিতেই যেন সে বিয়ে করেছিল কোহিনুরকে। মোমেনার সুযোগ-সুবিধার এক-তৃতীয়াংশও কোহিনুর পায়নি এ পর্যন্ত। চারদিকে বেড়া আর ওপরে টিন দিয়ে ছোট একটা ঘর করে দিয়েছে কোহিনুরকে। কিন্তু রাজ্যের সব শান্তি যেন এই বেড়ার ঘরেই এসে ভিড় করে। নম্র স্বভাবের কোহিনুর বাদলের মন খুশি রাখতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখে না।

বাদল ভেবেছিল সতিন আনাতে মোমেনা হয়তো পাল্টে যাবে। স্বামীর মন জয় করার জন্য সেও হয়তো ফন্দি-ফিকির আঁটবে। কিন্তু না, মোমেনা হয়ে ওঠেছে বিষধর সাপ। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বাদলকে ছোবল দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করেই যাচ্ছে।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন মোমেনা ফিরল না, বাদল নিজেই ফেরার পথ ধরল। তখনই দেখতে পেল তার বড় কন্যা লিজা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে একটা ছেলের সাথে কথা বলছে। মুখে হাসি ঝরে পড়ছে তার। পাড়ারই ছেলে। বাদলের মাথায় হঠাৎ রক্ত উঠে যায়। চিৎকার করে উঠে সে, ‘লিজা… শয়তানির মাইয়া শয়তানি…!’

ছেলেটা এক দৌড়ে গায়েব হয়ে যায়। লিজা স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ বাবার উপস্থিতি তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না। যেন এভাবে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে কোনো ছেলের সাথে কথা বলা একেবারেই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। লিজার এমন নির্লিপ্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বাদলের সহ্যের সীমা অতিক্রান্ত হয়ে যায়।

মেয়ের কাছে গিয়েই সজোরে লাথি বসায় বাদল। তারপর কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে হনহন করে হেঁটে স্থান ত্যাগ করে। লিজা তলপেটে হাত দিয়ে মাটিতে বসে থাকে। প্রস্রাব হয়ে গেছে তার। জায়গাটা পুরো ভিজে কাদা কাদা হয়ে গেছে। অথচ তখনো সে ভাবছে, ভাগ্যিস তুহিন পালিয়ে গেছে। না হলে কী লজ্জাই না সে পেত…!

(চলবে)

*****

[কীওয়ার্ডস:

অবিচার [ দ্বিতীয় পর্ব ] | সালসাবিলা নকি

অবিচার [ দ্বিতীয় পর্ব ] : সালসাবিলা নকি

অবিচার [ দ্বিতীয় পর্ব ] – সালসাবিলা নকি

ছোটোগল্প | অবিচার [দ্বিতীয় পর্ব]

সালসাবিলা নকির ছোটোগল্প | অবিচার [দ্বিতীয় পর্ব]

সালসাবিলা নকির ছোটোগল্প : অবিচার [দ্বিতীয় পর্ব]

সালসাবিলা নকির ছোটোগল্প – অবিচার [দ্বিতীয় পর্ব]

ছোটোগল্প , সমকালীন গল্প , জীবনধর্মী গল্প, নন-ফিকশন , গল্পীয়ান]

মন্তব্য করুন:
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত পোস্ট