একটি ভুলের গল্প

একটি ভুলের গল্প | জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রি 

এক.

ঘটনার শুরু প্রায় এক মাস আগে। ইদের পর মেসে ফিরে এসেছি। আমার আগের রুমমেট মেস ছেড়ে দিয়েছিল। আমি নতুন রুমমেটের অপেক্ষায় ছিলাম। একদিন সন্ধ্যায় বিছানায় বসে বই পড়ছিলাম, হঠাৎ মনে হলো উপর থেকে আমার পাশেই কিছু একটা পড়ল। আমি ভেবেছিলাম টিকটিকি হবে হয়তো। কিন্তু দেখলাম ওটা অন্যকিছু। খুব ছোট, এক ইঞ্চির মতো লালচে একটা বস্তু। আমি ভালোভাবে দেখতে গিয়েই অবাক হলাম। ওটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিল, এক ইঞ্চি থেকে দু ইঞ্চি, পাঁচ ইঞ্চি, সাত ইঞ্চি। ক্রমেই ওটা ফুলে ওঠছিল। খেয়াল করলাম ওটার ছোট ছোট চারটা হাত-পা আছে। যতই বড় হচ্ছিল ততই মানুষের মতো রুপ নিচ্ছিল, মুখ, চোখ, কান, নাক, ঠোঁট সব আমার চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছিল যেন। এরপর ওটা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া শুরু করল। অবশেষে ওটা একটা নবজাতকের রুপ ধারণ করল, লম্বা একটা নাড়ীও ছিল ওর। সারা গায়ে রক্ত লেগেছিল, যেন তখনই ভূমিষ্ট হয়েছে সে। আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎই ও চিৎকার করে কেঁদে উঠল আর আমি তখনই জ্ঞান হারালাম।

পরে শুনেছিলাম আমার চিৎকার শুনে অন্য রুমের সবাই ছুটে এসেছিল। আমার রুম ভেতর থেকে বন্ধ ছিল বলে মেসের সুপারভাইজারকে ডেকে দরজা ভাঙতে হয়েছিল। ভেতরে ঢুকে আমাকে ওরা অজ্ঞান অবস্থায় পায়, পরে হাসপাতালে ভর্তি করে। তিনদিন পর আমার জ্ঞান ফেরে।

সামান্য বিরতি নিয়ে আমি আবারও বলা শুরু করলাম। ডা. রউফ আমার কথা মনোযোগ সহকারে শুনছেন। ‘ঘটনাটার পর আমি চার-পাঁচ দিন বাড়িতেই ছিলাম। শারীরিক কোনো দূর্বলতা, জটিলতা, অসুস্থতা কিছুই ছিল না। তাই আবারও মেসে ফিরে আসলাম। এসে দেখি নতুন রুমমেট এসেছে। অনন্যা চাকমা নাম ওর। বেশ মিশুক আর বাচাল প্রকৃতির। সারাদিন হইচই করে কাটানো ওর অভ্যাস। ও মেসে আসার পর তেমন কিছুই হয়নি। শুধু একদিন রাতে অনন্যা মেসে ফেরেনি। বান্ধবীর জন্মদিন ছিল। রাতে ওখানেই থাকবে। আমি কলেজ, টিউশন শেষ করে সন্ধ্যায় রুমে ফিরেছিলাম। সাতটা বা সাড়ে সাতটা হবে তখন একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলাম। খুব তীক্ষ্ম সে আওয়াজ! কেন যেন সহ্যই করতে পারছিলাম না। আমাদের মেসটা আবাসিক এলাকায়। ধরে নিয়েছিলাম আশেপাশের কোনো ফ্ল্যাট থেকে বাচ্চার কান্না আসছে। কিন্তু কেউ বাচ্চাটার কান্না বন্ধ করানোর চেষ্টাই করছিল না। সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছিল, কান্নাও সমান তালে চলছিল। বিরক্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে গেলাম। ওখানে ঝুমা আপুকে বললাম, ‘দেখেন তো আপু কতক্ষণ ধরে বাচ্চাটা কাঁদছে কেউ থামাচ্ছো না ওকে। অসুস্থ হয়ে যাবে তো বাচ্চাটা।’ ঝুমা আপু অবাক হয়ে বললেন, ‘কোন বাচ্চার কথা বলছো?’ আমি বললাম, ‘আপনি কোনো কান্নার আওয়াজ পাচ্ছেন না?’ আপু বললেন, ‘কই না তো?’ তারপর আপু আমাকে তার পাশে বসতে বললেন। আমি কিছুক্ষণ বসলাম। নানা রকম গল্প করছিলেন আপু। ধীরে ধীরে আমি কান্নার আওয়াজের কথা ভুলে গেলাম। এরপর রাতে খেয়ে যখন রুমে ঘুমাতে এলাম তখন কোত্থেকে আবারও কান্নার শব্দটা ভেসে এলো। পুরো রাত ঘুমাতে পারিনি। আর কান্নার শব্দটিও এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয়নি।

সারা রাত ওভাবেই কাটালাম। ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল বোধহয়! সকালে রুমমেটের ডাকেই ঘুম ভাঙে। ও ফিরে আসার পর আবার যথারীতি ওর সেই হই-হুল্লোড়, এসেই আমাকে টেনে তুলে। আমাকে বান্ধবীর জন্মদিনে কী কী করেছে সব গল্প শুনতে হবে তাই। তারপর শুরু হয় ওর বকরবকর, কানের মাথা খাচ্ছিল চিবিয়ে চিবিয়ে। একেই তো সারারাত ঘুম হয়নি তারপর আবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই এত বকবকানিতে মাথাটা খুব ভার ভার লাগছিল। অনেক কষ্টে রুমমেটের থেকে ছাড়া পেয়ে আমি ওয়াশরুমে যায় গোসলের জন্য, ভেবেছিলাম গোসল করলে হয়তো খারাপ লাগা ভাবটা কমে যাবে, ফ্রেশ লাগবে। কিন্তু ওয়াশরুমে ঢুকার কিছুক্ষণ পর আমি লক্ষ্য করি একটা বাচ্চা চিৎকার করে কান্না করতে করতে ক্রমশই নালার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাটি যেন পিছনে পড়ে যাচ্ছে! আর বাঁচার জন্য চিৎকার করে কাঁদছে। আমি না ধরলেই ও ড্রেনে পড়ে যাবে! বাচ্চাটির কান্নার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, দুই হাতে কান চেপেও আমি তা প্রতিরোধ করতে পারছিলাম না। আবার চিৎকার করে কাউকে ডাকব সে শক্তিও আমার ছিল না, গলা দিয়ে একটা শব্দও বের হচ্ছিল না। তারপর আর কিছু মনে নেই আমার। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমি বাসায় আমার রুমে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। কী হয়েছিল বাবা জানতে চাইলে আমি ভয়ে বা লজ্জাতেই হোক কাউকে কিছু বলিনি। আমার চাপ পড়বে ভেবে বাবা আমাকে আর জোরও করেননি। ওই ঘটনার পর আমি আর মেসে ফিরি না, বাসাতেই থাকি। তবে নিজের সাথে অনেক সংগ্রাম করেও আমি বের করতে পারি না, আমার সাথে ঠিক কী হচ্ছে আর কেন হচ্ছে! দুইদিন বেশ ভালোই ছিলাম। দুইদিন পর বিকেলে আবার আমি সেই বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। ঘুমের মধ্যেই শব্দটা একটু একটু করে বাড়তে থাকে, এক সময় এত বেশি হয়ে যায় যে আমি উঠে পড়ি। ঘুম থেকে উঠে মনে হয় কান্নার শব্দটা আমার বারান্দা থেকে আসছে। আমি মা কে ডাকি অনেকবার, কিন্তু মা আসে না! পরে আমি নিজেই উঠে পড়ি কী হচ্ছে দেখার জন্য। আমি বারান্দায় গিয়ে যা দেখি, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না মোটেও। আমি ভেবেছিলাম পাশের বাড়ির বাচ্চাটা কাঁদছে! কিন্তু বারান্দায় গিয়ে দেখি একটা ছোট্ট বাচ্চা আমার বারান্দার সামনে যে নারিকেল গাছটা ছিল ওটা বেয়ে বেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে আর অনবরত কাঁদছে। ভয়ে আমার পুরো শরীর কাঁপছিল, আমি নিচে বসে হাঁটুতে মুখ গুজে প্রাণপণে মা কে ডাকতে থাকি। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না, কিন্তু যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখি আমি মায়ের কোলের মধ্যে ছোট বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছি। উঠে বসতেই মা আমাকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দেয়। আমি মাকে সব খুলে বলি। মাকে সব কথা খুলে বলার সময় আমি নিজেই আবিষ্কার করি, আমার সাথে এই ব্যাপারগুলো ঠিক তখনই ঘটত যখন আমি একা থাকতাম। যেমন আগের দুইদিন মা এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে কাছ ছাড়া করেনি আর সেদিন মা একটু বাইরে যেতেই আবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। মা কে সব বলার পর এই তো আমি আপনার কাছে আসি….

আমার সব কথা বলার পর ডা. রউফের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি উনি বেশ চিন্তিত। আমার সব কথা শোনার পর উনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার এই ঘটনার শুরুটা ঠিক কখন!’ কিন্তু আমি ঠিক করে কিছুই বলতে পারি না! দুই মাস আগে একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাই। তারপর থেকেই আমার এই সমস্যাগুলো দেখা দেয়। তবে দুইমাস আগে ঠিক কী ঘটেছিল তার কিছুই মনে করতে পারি না আমি। এই ঘটনার শুরু কোথায় বা কেন হঠাৎ আমার সাথে এ রকম ঘটতে শুরু হলো আমি কিছুই জানি না। এবার আমি কান্নাই ভেঙে পড়ি। ডা. রউফ নিজেকে সামলে আমাকে বোঝান যে, সব ঠিক হয়ে যাবে; তবে আজ উনি কিছুই বলতে পারছেন না। কাল যেন আমি সকালে মা কে নিয়ে উনার চেম্বারে আসি।

দুই.

আমি বাসায় চলে আসি। তবে তারপর থেকে আর এক মুহূর্তের জন্যেও আমি একা থাকিনি। সবসময় মা আমার পাশে পাশে ছিল। সকালে ডা. রউফের কথা মতো আমি আর মা উনার চেম্বারে যাই। উনার কথা শুনে প্রথমে আমি খুব রেগে যাই। কারণ, আমার সব কথা শুনার পর উনার মনে হয়েছে আমি হয়তো অ্যাবোর্শন টাইপ কিছু করিয়েছি আর সেই ঘটনার সূত্র ধরে আমার এই ভয় বা এ রকম মানসিক সমস্যা। আর আমার যেহেতু কিছুই মনে নেই, তাই আমি ঠিক করে কিছু বলতে পারছি না। এসব কথা শোনার পর লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছিল। তবুও নিজেকে সামলে আমার মনে হলো, সত্যের মুখোমুখি আমার হতেই হবে। এভাবে চলতে পারে না, আমাকে সত্যিটা জানতে হবে সেটা যতই কঠিন হোক না কেন! মা ডা. রউফ কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন তাহলে কি করার আছে?’ ডা. রউফ সমাধান হিসেবে বলেন, আমার কিছু মেডিকেল টেস্ট করতে হবে। তার ধারণাটা আসলে কতভাগ সত্য সেটা জানার জন্য। আমি তাতে রাজি হয়ে যাই। তখনই টেস্ট করা হয় আমার। সন্ধ্যার মধ্যেই সব রিপোর্ট রেডি করে ফেলেন ডা. রউফ। কিন্তু রিপোর্ট দেখে আমি যতটা না চমকে গিয়েছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি বিব্রত হয়েছিলেন ডা. রউফ। আমার রিপোর্টে কোনো সমস্যা-ই ছিল না, উনি যা কিছু ভেবেছিলেন তার কিছুই ঘটেনি আমার সাথে। ডা. রউফের ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়। কিন্তু এই লজ্জার হাত থেকে বাঁচলেও চিন্তা বাড়ে আমার অসুস্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে।

ডা. রউফ এবার এক এক করে আমার সব আত্মীয়দের সাথে কথা বলেন। সবার সাথে কথা বলার পরও তেমন বিশেষ কোনো সমাধান মিলে না। এরপর কথা বলেন আমার রুমমেটদের সাথে। আমার নতুন রুমমেট থেকে বিশেষ কিছুই জানতে পারেন না, কারণ আমার সমস্যা শুরুর পরেই ও এসেছে। এর আগের রুমমেটের সাথেও কথা বলেন এবং তার কাছ থেকে আমার সম্পর্কে জানতে পারেন যে- আমার কোনো দিনও কোনো রকম প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না কারও সাথে! আমি খুবই শান্ত আর নরম মনের একটি মেয়ে ছিলাম। তার সাথে আমি বেশিদিন ছিলাম না যদিও! তবুও যতদিন সে ছিল আমার সাথে, ততদিন আমার খারাপ কিছু পায়নি সে। মেসে উঠার সতেরো দিনের মাথায় তার বিয়ে ঠিক হওয়াতে তাকে মেস ছেড়ে চলে যেতে হয়। তবে সে থাকাকালীন আমার কোনো সমস্যা ছিল না। তাই এই রুমমেট আপুর সাথে কথা বলেও কোনো সুবিধা হলো না দেখে বেশ আশাহত হয়ে পড়েন আমার পরিবারের সবাই এবং ডা. রউফ নিজেও। এরপর আবার কথা বলা হয় আমার ওই রুমমেট আপুর আগের রুমমেট মানে আমার সাথে ক্লাসমেট রিক্তার সাথে। রিক্তা প্রথমে আমার অসুস্থতার কথা শুনে ঘাবড়ে যায় আর তারপর অনেক ভেবে চিন্তে বলে ও নিজে ডা. রউফের সাথে আলাদা ভাবে দেখা করতে চায়।

ডা. রউফ রিক্তার সাথে দেখা করেন। এরপর ডা. রউফ আর রিক্তার মধ্যে যা কথাবার্তা হয় তার সারমর্ম হলো- রিক্তা আমার রুমমেট থাকাকালীন ওর একটা প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের জের ধরে একবার সে প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। আর তারপর থেকেই শুরু হয় ওর উপর ওর প্রেমিকের টর্চার। অ্যাবোর্শন ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না রিক্তার কাছে। আর ওরকম একটা সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতোও কেউ ছিল না ওর! বাধ্য হয়েই রিক্তা আমাকে সব খুলে বলে এবং ওর অ্যাবোর্শন করানোর জন্য আমার কাছে সাহায্য চায়। আমি নাকি খুব রূঢ় হয়েছিলাম ওর সাথে! ওই রুমও ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। তবে ওর অসহায়ত্ব দেখে এক সময় আমি রাজি হয়ে যাই, ওর সাথে ক্লিনিক এ যেতে। আমি নাকি রিক্তার সাথে ক্লিনিকে গিয়েছিলাম এবং আমিই ওর গার্ডিয়ান হয়েছিলাম সেদিন। রিক্তা খুব ভয় পাচ্ছিল দেখে ওর পাশেই ছিলাম। তবে ওর যখন অ্যাবোর্শন করাচ্ছিল তখন আমি সেগুলো নিজ চোখে দেখে, নিজেকে সামলাতে না পেরে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে আসি। আর বাইরে বের হয়েই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। এরপর আমার জ্ঞান ফেরার আগেই রিক্তা সবকিছু নিয়ে মেস ছেড়ে চলে যায়! লজ্জায় আর আমার সামনে আসেনি! কিন্তু আমার সাথে যে এত কিছু হয়েছে, তা সে জানতো না। এখন জানার পর আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। তাই গ্লানি দূর করতে আর আমাকে সুস্থ হতে সাহায্য করতে ও সব কথা বলতে এসেছে, যতই হোক আমার অসুস্থতার কারণ তো রিক্তা-ই!

তিন.

রিক্তার সব কথা শোনার পর ডা. রউফ আমাদের সমাধান দেন যে, আমার বিয়ে দিয়ে দিতে; আমার একটা বাচ্চা আসলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু রিক্তার বলা সব কথা শোনার পর আমার আবার সেই ভুলে যাওয়া দিনগুলো চোখে ভেসে উঠে। মনে পড়ে যায়- সেই দিনটার কথা, যেদিন আমার চোখের সামনেই রিক্তার বাচ্চাটাকে একটু একটু করে মেরে ফেলা হচ্ছিল। আমার মনে আছে, স্পষ্ট মনে আছে! ওই সময় বাচ্চাটি চিৎকার করে কাঁদছিল আর বলছিল, ‘মেরো না, আমায় মেরো না!’ আমি সেদিন কিছুই করতে পারিনি, উল্টো ওকে মেরে ফেলার সময় রিক্তার সাথে ছিলাম। আবার সেই অভিশপ্ত দিনটি আমার গায়ে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে। পারছিলাম না চোখের সামনে থেকে ওই মুহূর্ত গুলি সরাতে! অপরাধবোধ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল আমাকে। আমি এত বড় একটা পাপে সামিল ছিলাম? আমি? যে কিনা এত এত বেশি করে বাচ্চা ভালোবাসি! আমি এসব ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম! ওদিকে বাবা-মা ডা. রউফের কথা অনুযায়ী আমার বিয়ে ঠিক করছিলেন। কিন্তু এ রকম একটা মানসিক রোগীকে কে বিয়ে করবে? এটাও চিন্তার বিষয় ছিল। পরিশেষে আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়। কিন্তু আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না এসব। সবসময় আমার কানের মধ্যে সেই বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভাসতো। আমার বারবার মনে হচ্ছিল, একটা বাচ্চাকে মারতে আমি সাহায্য করেছি; আবার সেই আমিই আরেকটা বাচ্চার মা হবো? সম্ভব এটা? আমি কী কোনোদিন আমার অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাব?

আমার অবস্থা দিন কে দিন খারাপ থেকে আর বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। সেটা আমি ছাড়া আর কেউ জানতো না। আমার কানে সবসময় বাচ্চার কান্নার আওয়াজ, মাথায় সবসময় অপরাধবোধ, আর হাতে একটা নিষ্পাপ শিশুর জীবন হত্যার রক্ত নিয়ে আমি পাগল হয়ে ওঠেছিলাম প্রায়। ওদিকে সবাই আমার বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত, রাত পেরোলেই আমার বিয়ে। কিন্তু আমি আর পেরে উঠছি না, আর পারছি না আমি!

অতঃপর আমি জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, পাপ করেছি শাস্তি পাব না তা কি হয়! ফাঁসির দড়ি গলায় পরে দাঁড়িয়ে আছি, এবার শুধু ঝুলে যাওয়ার অপেক্ষায়। একটু বাদেই টুপ করে একটা শব্দ হলো। আমার পায়ের নিচ থেকে মেঝেতে চেয়ার পড়ে যাওয়ার শব্দ। আমি বুঝতে পারছি আমি মারা যাচ্ছি! তবে আমার একফোঁটাও বাঁচার জন্য চেষ্টা নেই, বরং আমার ভালোই লাগছে। আমি যেন মুক্তি পাচ্ছি! আমার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে, হৃৎস্পন্দন থেমে যাচ্ছে। সামনে পুরো মেঝে জুড়ে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে অসংখ্য রঙিন কাগজ। প্রতিটা কাগজে লেখা- ‘সব শিশুরা ভালো থাক, সুস্থ থাক, নিরাপদে থাক…!’

[কীওয়ার্ডস:

একটি ভুলের গল্প | জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রি

একটি ভুলের গল্প : জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রি

একটি ভুলের গল্প – জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রি

ছোটগল্প | একটি ভুলের গল্প

জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রির ছোটগল্প | একটি ভুলের গল্প

জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রির ছোটগল্প : একটি ভুলের গল্প

জান্নাতুন ফাতেমা রাত্রির ছোটগল্প – একটি ভুলের গল্প

ছোটগল্প , সমকালীন গল্প , জীবনধর্মী গল্প, নন-ফিকশন , গল্পীয়ান]

 

মন্তব্য করুন:
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত পোস্ট