আমাদের মেঘবাড়ি | মৌলী আখন্দ | রিভিউ: সালসাবিলা নকি

মৌলী আখন্দের উপন্যাস ‘আমাদের মেঘবাড়ি’ | রিভিউ: সালসাবিলা নকি

প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজস্ব কিছু স্বপ্ন থাকে। একটা স্বপ্ন পূর্ণ না হলে অন্য একটা হয়তো পূরণ হয়। একারণেই মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন আছে বলেই তো বেঁচে থাকা!

কিন্তু যাদের স্বপ্ন পূরণ হওয়ার সুযোগই থাকে না! অথবা যারা স্বপ্ন দেখতে ভুলেই যায় কিংবা ভয় পায় স্বপ্ন দেখতে তাদের কী হয়? নিশ্চয়ই বলবেন, ‘তারা তো বেঁচে থেকেও মৃত।’ আজ যে বইটি নিয়ে বলব তাতে এমনই একটি মেয়ের গল্প বলা হয়েছে, যার দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল।

কাহিনি সংক্ষেপ:

‘আমাদের মেঘবাড়ি’ উপন্যাসটি দুটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডটি ‘সরীসৃপ’, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মীরার প্রথম জীবন নিয়ে। যখন সে ছাত্রী ছিল। জীবনের পারিপার্শ্বিকতার কারণেই হোক বা অল্প বয়সের ভুলের কারণেই হোক, কলেজের সিনিয়রের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল মীরা। কিন্তু এই সম্পর্কই মীরাকে কালসাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। আর ছোবলের পর ছোবল দিয়ে জর্জরিত করতে থাকে। মীরা কি পেরেছিল এই অসুস্থ সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে?

দ্বিতীয় খণ্ডটি মীরার বৈবাহিক জীবনের। যেখানে মীরা তার ছোট্ট মেয়ে লামিয়াকে মেঘবাড়ির স্বপ্নপ্রাসাদের গল্প শোনায়। গল্পের পেছনে থাকে তার হাজারও দীর্ঘশ্বাস। মেডিকেলের মেধাবী ছাত্রী কেন আজ ডাক্তার না, কেন সে স্বামীর অপমান, অত্যাচার সয়ে যাচ্ছে! কাঁটায় ভরা জীবন ছেড়ে মেঘবাড়ির স্বপ্নপ্রাসাদের খোঁজে কি বের হতে পারে মীরা?

কেমন লেগেছে বইটি:

কাহিনি সংক্ষেপে শুধু দুঃখ, ক্লেশ ও ব্যর্থতাটুকুই উল্লেখ করেছি। কিন্তু ‘আমাদের মেঘবাড়ি’ শুধু হেরে যাওয়ার গল্প না। চোরাবালিতে ডুবে যেতে যেতে শেষ মুহূর্তে বেঁচে যাওয়ার গল্প। বাঁকা হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ড নিয়েও আরেকবার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর গল্প।

যারা বলে, ‘আর কিছু হবে না, এভাবেই যেতে হবে বাকিটা পথ’ তাদের জন্য শিক্ষণীয় গল্প। শেষ বলে আসলে কিছু নেই। চাইলেই নতুন করে শুরু করা যায়। চাইলেই খোলা হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। প্রয়োজন শুধু নিজের ভেতর থেকে সিদ্বান্তটা নেয়ার।

আরও পড়ুন: একা | মৌলী আখন্দ | রিভিউ: সালসাবিলা নকি

পছন্দের কাউকে নিজের দখলে নিয়ে নেওয়াটা ভালোবাসা নয়, কিংবা অহেতুক সন্দেহ করাকে ‘ভালোবাসি তাই’ বলে জাস্টিফাই করা যায় না। যার ভয়ে অতিষ্ঠ হয়ে থাকতে হয় তাকে অন্তত ভালোবাসা যায় না। এই গল্পে ভালোবাসার সংজ্ঞা ও মানসিক রোগের পার্থক্য যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই উপন্যাসে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার মতো ব্যাপার হচ্ছে এর চরম বাস্তব প্রেক্ষাপট আর মীরার এক মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তটা, যেটা তাকে খাঁচা থেকে বের করে আনতে পেরেছে।

শেষপর্যন্ত মীরা কী করেছে সেটা জানার জন্য পাঠক পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উলটে যাবেন, এরই মাঝে বারবার শিউরে উঠবেন, হয়তো বইয়ের দুই একটা পৃষ্ঠা ভিজে যাবে চোখ থেকে টুপ গড়িয়ে পড়া অশ্রুজলে, অথবা নিজের অজান্তেই বলে বসবেন, ‘এটা তো আমার জীবনেরই গল্প!’

মৌলী আখন্দের লেখা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। মেদবিহীন ঝরঝরে লেখা, এক বসাতেই বইটি পড়ে ফেলা যায়। উপন্যাসের শেষ পাতায় থাকে তৃপ্তির ছোঁয়া।

তাঁর পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি লেখালেখি করার উদ্দেশ্য হলো, সমাজের পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকারে আলো জ্বালানো। এই মহৎ উদ্দেশ্য সফল করতে তাঁর বই কিনে পড়া আমাদের সাধারণেরও দায়িত্ব। কি! ভুল বলেছি?

এক নজরে: আমাদের মেঘবাড়ি

বইয়ের নাম: আমাদের মেঘবাড়ি

লেখক: মৌলী আখন্দ

জনরা: উপন্যাস

প্রকাশনী: বিবলিওফাইল

প্রচ্ছদ: অনিন্দ্য রহমান

নামলিপি: আশিকুর রহমান বিশাল

মলাট মূল্য: ২০০ ৳

প্রকাশকাল: ২০২০

 

রিভিউ: সালসাবিলা নকি

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: