আলেয়া [তৃতীয় পর্ব]

আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ]

প্রথম পর্ব পড়তে ক্লিক দিন:

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে ক্লিক দিন:

‘সাফাত, বিষয়টা বুঝতে পারছো?’ আরিফ চশমার কাচটা মুছতে মুছতে বলল সাফাতকে। সাফাত মাথা নাড়াল। হাতের কাছে থাকা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে নিলো। এক চুমুক খাওয়ার পর আরিফের দিকে তাকাল। সাফাত কিছু বলার আগেই আরিফ বলতে লাগল, ‘কী ভাবছ! আমি তবুও কেন স্বাভাবিক থাকছি? সাফাত সময়টা এখন নয়। আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। রৌদ্রার বয়স বারো বছর হবার আগ পর্যন্ত।’

‘স্যার, আমার একটা প্রশ্ন আছে।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, সাফায়েত। আরিফ মাথা নেড়ে বলার জন্য ইশারা দিলো।
‘এই যে আমরা জিন নিয়ে খেলা করছি। আমরা চাইলেই তো মানুষকে অমরত্বের স্বাদ দিতে পারি। পারি না?’
‘আসলে সাফাত, আমাদের আবিষ্কারে ভালো দিকের পাশাপাশি খারাপ দিকের কথাও ভাবতে হবে। আমরা ক্রিসপার ক্যাস-৯ টেকনোলোজি ব্যবহার করে মানুষে জিনোম সিকুয়েন্স পরিবর্তন করতে পারি। আর এই জিনোম সিকুয়েন্স পরিবর্তনের খেলাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খেলা। কিন্তু মানুষ যখন অমরত্ব লাভ করবে, তখন পৃথিবীতে আর শান্তি থাকবে না। প্রাকৃতিক নিয়মে বাধা সৃষ্টি হবে। যা পৃথিবীর জন্য খুবই ক্ষতিকর। আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে কিছু করব না। বরং যেটা প্রকৃতির উপকার করবে সেটাই করব! বুঝলে?’
‘জি স্যার। এইজন্যই এই ক্রিসপার ক্যাস-৯ টেকনোলোজিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে! এইবার বুঝতে পারছি। তবে আপনি যেটা করেছেন!’

সাফাত বেশ আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করল আরিফকে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না, আরিফ এরকম একটা আবিষ্কার মানুষ থেকে লুকিয়ে রেখেছে। পুরো পৃথিবী এই আবিষ্কারের কথা জানলে আরিফকে মাথায় তুলে রাখবে। আবার, হতে পারে এই নিষেধাজ্ঞার কারণে আরিফকে শাস্তি পেতে হবে।

সাফাতের প্রশ্নের উত্তর দিতে আরিফের ভালোই লাগছে। এই প্রথম বিশ্বস্ত একটা মানুষ পেয়েছে সে। আরিফের মামা মিরাজ সাহেব তার জন্য উপযুক্ত মানুষই পাঠিয়েছে। এইজন্য মামাকে মনে মনে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলো আরিফ। আরিফ ইঁদুরের খাঁচাটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি রৌদ্রার ওপর যে এক্সপেরিমেন্ট করেছি, সেটা তুমি আর আমি জানি। এটা মাথায় রাখবে। এমন কি রৌদ্রার মা, লি জিকিও জানে না!’

‘স্যার, আপনি ডলফিনের জিন নিয়েছিলেন। কিন্তু কথা হলো, আপনি ডলফিনকেই কেন বাছাই করেছিলেন?’
‘কারণ, ডলফিন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। কিন্তু, প্রকৃতি ওদের ওপর অবিচার করেছে। ওরা যদি মানুষের মতো বিবর্তিত হতে পারত, মানুষের মতো হাত পা পেত, তাহলে পুরো পৃথিবীর রূপই পাল্টে ফেলত! বুঝলে সাফাত।’

কথাটা শেষ করতেই আরিফের ফোন বেজে ওঠল। হানিফ ফোন করেছে। আজকে ওদের হানিফের ওখানে যাওয়ার কথা। কিন্তু আরিফের হাতে এখন বিশেষ এক কাজ। ইঁদুরের ওপর তার নতুন এক্সপেরিমেন্ট! আজ সকালেই ইঁদুরগুলোকে কিনে এনেছে আরিফ। জেনিটিক গবেষণায় যত পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়, বেশির ভাগই হয় ইঁদুরের ওপর। এর মূল কারণ, ইঁদুরের সাথে মানুষের মধ্যে জিনগত মিল প্রায় ৯০%। এ ছাড়াও- ইঁদুর সহজলভ্য ও দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারা প্রাণী আর ইঁদুরের মধ্যে জিনগত মিউটেশনের ফলাফল দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা যায়!

ফোনটা ধরল আরিফ, ‘হ্যালো, হানিফ সাহেব কেমন আছেন?’
‘জি ভালো। আজকে না আসার কথা?’
‘আজকাল দেখি ডাক্তাররা রোগীর বাড়িতে ফোন দিয়ে রোগী নিয়ে যায়। ভালোই।’ একটু মশকরা করেই বলল আরিফ।
হানিফ একটু ভড়কে গেল। কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘রসিকতা তো ভালোই পারেন। আসলে তেমন কিছু নয়! আপনি আমার প্রিয়। আর আপনার কেসটা আমার জন্য এক্সপেরিমেন্টাল কেস। তাই আরকি! অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর বুঝলাম আপনার ওয়াইফ সিজোফ্রেনিয়াতেও আক্রান্ত!’
আরিফ একটু হতাশার সুরেই বলল, ‘আমি তো একটু ব্যস্ত আছি আজ। লি জিকিকে একা পাঠাই?’
হানিফের খুশিতে লাফাতে ইচ্ছে করছিল। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি! খুশিটাকে আড়াল করে আরিফকে সম্মতি জানালো। এরপর ফোনটা তড়িঘড়ি করে রেখে দিলো।

‘তোমাকে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার অভিনয় করতে হবে, বিউটিকুইন।’ লি জিকির ওড়না সরাতে সরাতে বলল, হানিফ।
লি জিকি বেশ স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলো, ‘আজকে বাসাতেই নিয়ে আসলেন। তা লক্ষণগুলো বলুন, মিস্টার!’
‘অস্বাভাবিক আচরণ করতে হবে। উল্টাপাল্টা চিন্তাভাবনা করবে। আরিফকে বেশি বেশি ভড়কে দিতে হবে। দ্বিতীয়বার উলঙ্গ হওয়ার মতো ভুল কোরো না। আমি বিষয়টাকে ঘুরিয়ে তিন-চারটা রোগ দেখাব। আরিফ যেন এই বিষয়ে টের না পায়।’
হানিফ ততক্ষণে লি জিকির পুরো শরীরের ওপর আধিপত্য নিয়ে ফেলল। লি জিকির সারা শরীরে তার লোলুপ দৃষ্টি। নারী শরীরের স্বাদ। প্রত্যেকটা পুরুষই এই জায়গায় বেশ দুর্বল। নারীরা সেই জায়গাটাতেই টোপ ফেলে।

‘আমাকে আরেকটা কাজ করে দিতে হবে। বেশ কঠিন কাজটা।’ লি জিকি হানিফকে কিছুটা বাঁধা দিয়ে বলে।
‘কী কাজ? তোমার জন্য সব করব। শুধু বাধা দিয়ো না গো।’ হানিফ পাগলের মতো কথাগুলো বলতে লাগল।

এই সময়ে নারীরা চাইলে একটা পুরুষের সর্বস্ব কেড়ে নিতে পারে। পুরুষগুলো এই সময়টাতেই বেশি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। অথচ, দেখা যায় অধিকাংশ প্রতিজ্ঞা বিফলে যায়। কিন্তু হানিফের প্রতিজ্ঞার উপর বেশ ভরসা রয়েছে লি জিকির। লোকটাকে বশ করা সহজ হয়েছে। লি জিকি চিন্তিত, বাসায় আসা উঠকো ছেলে সাফাতকে নিয়ে। ছেলেটার জন্য কাজগুলো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই তো গতকাল খাবার টেবিলে আরিফকে এম্ফিটামিন ওষুধটা খাওয়াতে গেল। আরিফ প্রায় খেতে যাবে তখন সাফাতের ধাক্কা লেগে পড়ে গেল ওষুধটা। ভাগ্যিস আরিফ দেখার আগেই ওষুধটা সরিয়ে ফেলছিল লি জিকি। আরিফকে নেশাগ্রস্ত করে রাখার জন্য এম্ফিটামিনের চেয়ে ভালো আর কিছু হতেই পারে না।

‘কী ভাবছ এত? পুতুলের সাথে শুতে কার ভালো লাগে! এরকম হলে আমি আর চাই না তোমায়!’ হানিফের কণ্ঠটা শুনে লি জিকির হুঁশ ফিরল।
‘আমি আজ একটু সিক। ব্যাপার না, অন্য দিন আমার পুতুলের মুখোশ দেখিয়ে দেবো। আপনি বিছানাতে বেশ পারদর্শী। আমার বেশ ভালোই লেগেছে। আজ আসি।’

নিজেকে গুছিয়ে নিলো লি জিকি। আজ সত্যিই ওর শরীরটা কেমন যেন লাগছে! মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। অন্য দিন হলে হানিফের এই তাচ্ছিল্যকে একদম গুলিয়ে খাইয়ে দিতো। ওর ক্ষমতা সম্পর্কে হানিফের ধারণাই নেই। ব্যাপার না, লি জিকিকে বাসায় ফিরতে হবে।

বাইরে বের হতেই এক চিলতে রোদ তার চোখের পাতা স্পর্শ করল। কোনোরকমে একটা রিকশা ঠিক করল ও। শরীরটা যেন নেতিয়ে আসতে চাইছে ওর। মাথার ভেতরের মগজ যেন বের হয়ে যাবে। বাড়ির সামনে এসে রিকশা থামল। রিকশাতেই এলিয়ে পড়ল লি জিকি, নামতে পারল না আর! বাড়ির গেটটা অস্পষ্ট-ঝাপসা হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

আরিফ লি জিকিকে বিছানাতে শুইয়ে দিলো। রৌদ্রা মায়ের কাছে আসছে না দেখে আরিফের কেমন যেন খটকা লাগল। তাহলে কি যার জন্য এত বছর তার অপেক্ষা সেটা শুরু হয়ে গেছে!

বাইরে আষাঢ়ের মুষলধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এই আষাঢ়ের বৃষ্টি আরিফের একদম অসহ্য লাগে। এই আষাঢ় আরিফের জীবনের কাল। এক আষাঢ়ে সে তার মাকে আর বাবাকে হারালো। আরেক আষাঢ়ে তার জীবনের সবচেয়ে ভুলটা হয়ে গিয়েছিল। তার চোখের সামনে সব কেমন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠল। দশ বছর আগের সেই দিনগুলো। আরিফ আস্তে আস্তে হেঁটে রৌদ্রার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর মাথায় হাত দিলো।

‘তুমি আমার একমাত্র সম্বল, রৌদ্রা। তুমি সাধারণ কেউ না! এটা মনে রাখবে মা।’
বাবার মুখে এই প্রথম এমন ‘মা’ ডাক শুনে রৌদ্রার খুব জোরে কান্না পেল। কান্নাটাকে আড়াল করতে চাইলো রৌদ্রা। রৌদ্রার বয়স পাঁচ বছর। অথচ ও জানে, ও সাধারণ কোনো মানুষ না। কী অদ্ভুত!
‘তুমি কি এইজন্য মন খারাপ করে আছো মা?’
‘বাবাই, আমি সব জানতে চাই। বলবে?’
‘বলব। ধৈর্য ধরো। তোমার সাহায্য চাই, রৌদ্রা। করবে না মা?’

রৌদ্রা বাবাকে আশ্বস্ত করে জড়িয়ে ধরল। আরিফও শক্ত করে রৌদ্রাকে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্রা জানে, তার বারো বছর হওয়া অবধি তাকে অনেক কাজ করতে হবে। যেখানে পাঁচ বছরের অন্য সব বাচ্চারা পুতুলখেলা ছাড়া কিছুই বুঝে না। সেখানে রৌদ্রা জানে- কীভাবে ডলফিনের জিন মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে একজন মানুষকে অন্যদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ, মেধাবী বানানো যায়! যেখানে অন্য বাচ্চাদের হাতে খেলনাপাতি আর পুতুল, সেখানে ওর হাতে এখন ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স। জিনোম সিকুয়েন্সের খেলাটাই যেন বেশি টানে ওকে!

সন্ধ্যার দিকে লি জিকির ঘুম ভাঙল। ঘরে একটা ড্রিম লাইট জ্বালানো। ওর কিছুই মনে নেই। কখন বাসায় আসলো। কখন বিছানায় আসলো। আর কিছু মনে করতেও পারছে না। বিছানা ছেড়ে উঠবে তখনই রুমের লাইট জ্বলে ওঠল। লি জিকি একটু ভয় পেল।

‘রৌদ্রা তুমি? কিছু বললে মামুণি?’
রৌদ্রা বিছানায় পা দুটো ঝুলিয়ে বসল। আর নিজের কোমড় সমান চুলের বেণিতে হাত বুলিয়ে বলল, ‘মাম্মাহ, তুমি আমাকে ভালোবাসো? বাবাইকে ভালোবাসো?’
‘বাসি তো। তোমরা ছাড়া আমার কেউ আছে নাকি।’
রৌদ্রার মুখটা হাসফাঁস করতে লাগল। কিন্তু যেহেতু সত্য বলার সময় এখন নয়, তাই কথা ঘুরিয়ে ফেলল।
‘মাম্মাহ, তুমি চাইনিজ রান্না পারো?’
‘পারি তো। খাবে তুমি? কিন্তু তোমার বাবাই তো একদম পছন্দ করে না।’
‘আমিও করি না।’

কথাটা বলেই দৌড় দিয়ে অন্য রুমে চলে গেল, রৌদ্রা! লি জিকির মেজাজ খারাপ হলো। শত হলেও ওটা ওর দেশ। দেশের প্রতি তার নাড়ির টান রয়েছে। মেয়েটাও একদম বাবার মতো হয়েছে। অথচ, মেয়েটাকে পেটে নিয়ে বড় করছে ও! অবশ্য একটা বিষয় লি জিকি বুঝতেই পারে না। রৌদ্রা আর আরিফের জন্য লি জিকির কেন একটুও মায়া কাজ করে না! ওদের প্রতি এত ঘৃণা কীসের? শুধুই কি লি জিকির বাবার অপমানের প্রতিশোধ নিচ্ছে লি জিকি!

বাবার কথা মাথায় আসতেই ফোনটা হাতে নিলো লি জিকি। একশোর বেশি কল এসেছে ওর বাবার। নিশ্চয় জরুরি কোনো বিষয়। নিজের উপর রাগ হলো ওর। বাবার জন্য কিছুই করতে পারছে না। ফোন হাতে নিয়েই বাবাকে কল করল লি জিকি।
‘বাবা, আমার কেন জানি ঘুম পেয়েছিল?’
‘তোমার কিছু পাঠানোর কথা ছিল!’ ওপাশ থেকে লি জিকির বাবা বেশ রাগী কণ্ঠে বলে ওঠল।
‘আমি এখুনি পাঠাচ্ছি। মাত্র কয়েক মিনিট।’
‘আচ্ছা।’

লি জিকি ফোন রাখতে যাবে। তখন অপর পাশ থেকে একটা কণ্ঠ শুনল। যেটা ওর মায়ের। নিশ্চয় ওর সাথে কথা বলতে চেয়েছে। কিন্তু লি জিকি চায় না মায়ের সাথে কথা বলতে। ওই মানুষটাকেও ওর ঘৃণা হয়। কীভাবে একজন মানুষ নিজের মেয়ে আর স্বামীকে সার্পোট না করে মেয়ের বরকে সার্পোট করে? ফোন দিলেই শুধু বলে, ‘ওটা তোর স্বামী। এমন করিস না। তোর বাবা আর তুই পাপ করছিস।’ অদ্ভুত আর অসহ্য কথাবার্তা। এইজন্যই এই মানুষটাকে লি জিকির প্রচণ্ড ঘৃণা লাগে!

**********

৭ বছর পরে….

আরিফ আর সাফাত বেশ মনোযোগ দিয়ে একটা ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্সে পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে। আর মাত্র কয়েকটা ধাপ পরেই আবিষ্কৃত হবে আরিফের আজীবনের স্বপ্ন! সেই স্বপ্নের সঙ্গী রৌদ্রা ও সাফাত। তাই শেষবারের মতো জিনোম সিকুয়েন্স পর্যবেক্ষণ করছে ওরা। এরপর, ভাইরাসটা সরাসরি ক্যান্সার আক্রান্ত অদিতির শরীরে প্রবেশ করানো হবে। যদিও এরকম ট্রায়াল ছাড়া সরাসরি মানুষের শরীরে ভাইরাস (ভ্যাক্সিন) প্রবেশ করানোতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওদের প্ল্যান ছিল, শুরুতে একটা ইঁদুরের ওপর ট্রায়াল দেবে। যেটার শরীরে প্রথমে ক্যান্সার সেল প্রবেশ করিয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত করাবে। এরপর, ইঁদুরটার শরীরে তাদের আবিষ্কৃত ভাইরাসটি প্রবেশ করিয়ে সেটার কার্যক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করবে।

কিন্তু একুশ বছর বয়েসী অদিতির জেদের কাছে আরিফ আর সাফাত হেরে গেল। অদিতি সাফাতের প্রেমিকা। যদিও সাফাত তাকে নিজের ছাত্রী হিসেবেই পরিচয় দেয় আরিফকে। কিন্তু আরিফের এসব বুঝতে বাকি থাকে না। কারণ নিজেদের গবেষণা বিশ্বস্ত কাউকে ছাড়া মূর্খের মতো কে শেয়ার করবে!

অদিতি মেয়েটা নিজেও একজন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্রী। বেশ ফুরফুরে জীবনযাপন ছিল তার। পাখির মতন ওড়ন্ত স্বভাব, সারাদিন লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে কাটাত। পেছনে কোনো বাধা নেই। কিন্তু এক কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ব্ল্যাড ক্যান্সার তার শরীরে হানা দেয়। ব্লাড ক্যান্সারের একদম শেষ পর্যায়ে অবস্থান তার। সাফাত, অদিতির ভার্সিটির শিক্ষক। স্যারের সাথেই প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল সে।

হঠাৎ এক দিন সাফাতের কাছে এই গবেষণার কথা শুনে এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আর চমকপ্রদ আবিষ্কারের অংশ হওয়া থেকে নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারেনি সে। যদি আবিষ্কৃত ভাইরাসটি ক্যান্সারকে আটকাতে নাও করতে পারে, বরং অদিতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় তাতেও অদিতির মনে আফসোস নেই! কারণ অদিতির জীবন এমনিতেই ব্লাড ক্যান্সারের দাবানলে শেষ।

সাফাত আরিফের দিকে মুখ তুলে হাসল। ‘স্যার, আমরা এবার সফল হবো। এখন মনে হয় সব খেলার সমাপ্ত ঘোষণা করা উচিত?’
‘না সাফাত। রৌদ্রার জন্মদিন কাল। তুমি যাও। আমি একটু পর আসছি।’
সাফাত চলে যাবার পর আরিফ হুইল চেয়ারটার হাতলটা ঘুরিয়ে নিজের গবেষণা ঘরটা একবার দেখে নিলো। চুলটাকে উষ্কখুষ্ক করে, মাথাটা খানিকটা কাত করে নিলো।

রাতের আকাশে তারার দিকে তাকিয়ে রৌদ্রা। একটা চাঁদ! জোছনা রাত যাকে বলে। কিন্তু ওর মনটা ভীষণ খারাপ। পৃথিবীতে আগাম সবকিছু বুঝে ফেলার ক্ষমতা কয় জনের থাকে! রৌদ্রার কী নেই! সব কিছুই আছে। আর একদিন পর, সে বারো বছরে পা দেবে। অথচ- তার চিন্তাভাবনা, মেধা, বুদ্ধিমত্তা তাকে দিনকে দিকে অনেক অসীমে নিয়ে যাচ্ছে। সে পাখির ভাষাও বুঝে ইদানীং।

ওইদিন দুটো পাখি এসে জানালার গ্রিলে বসল। একটা পাখি বিষণ্ণ মনে অন্য পাখিটাকে বলল, ‘কেঁদো না। তোমার স্বামী নিশ্চয় ফিরবে!’
অন্য পাখিটা কাঁদছিল কিনা, তা রৌদ্রা খেয়াল করেনি। খেয়াল করার মতো মনের অবস্থা ছিল না। তার চিন্তাভাবনা সব সময় মা-বাবাকে নিয়ে! তার মা-বাবার ভালোবাসা সত্যিই কী সুন্দর! বাইরে থেকে দেখে, যে কোনো মানুষ হিংসা করবে, প্রশংসা করবে!

‘এত সুন্দর দম্পতি! বাহ! কী দারুণ ওদের প্রেম!’
অথচ রৌদ্রা জানে, এই পৃথিবীতে তার মা-বাবার মতো বিষাক্ত সম্পর্ক আর একটাও নেই! কেন এই বিষাক্ত সম্পর্কের ফসল তাকেই হতে হলো? কেন? উত্তর খুঁজে পায় না, রৌদ্রা!

(চলবে)

*****

[কীওয়ার্ডস:

আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ] | ইসরাত জাহান জান্নাত

আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ] : ইসরাত জাহান জান্নাত

আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ] – ইসরাত জাহান জান্নাত

ছোটগল্প | আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ]

ইসরাত জাহান জান্নাতের ছোটগল্প | আলেয়া [ তৃতীয় পর্ব ]

ছোটগল্প, সমকালীন গল্প, থ্রিলার, ফিকশন, গল্পীয়ান]

মন্তব্য করুন:
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত পোস্ট