প্রচলিত বানান বিভ্রাট

প্রচলিত বানান বিভ্রাট

প্রিয় পাঠক, গল্পীয়ান বানান ক্লাসের প্রথম কিস্তিতে আজ আমরা জানব কিছু প্রচলিত বানান বিভ্রাট সম্পর্কে। দেখতে কিংবা শুনতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় অনেক বানান নিয়ে আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি। দুটো বানান গুলিয়ে ফেলে একটার জায়গায় অন্যটা লিখি। আশা করি, এই লেখাটি পড়ার পর আপনাদের আর ভুল হবে না। চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

  • ভাবি / ভাবী / ভাবি

ভাবি হলো কোনো কিছু ভাবা অর্থে প্রথম পুরুষের ক্রিয়ারূপ। যেমন: আমি ভাবি, আমরা ভাবি, এভাবে তো ভাবিনি।

আবার বড়ো ভাইয়ের স্ত্রীকেও ভাবি বলা হয়। এক্ষেত্রে ভাবি হলো বিশেষ্যপদ।

অন্যদিকে ভাবী অর্থ হলো ভবিষ্যৎ, অনাগতকাল কিংবা ভবিষ্যতে হবে এমন।

আশা করি, এখন থেকে আর কেউ ভাবি, ভাবী আর ভাবি তিনটা গুলিয়ে ফেলবেন না।

  • হল / হলো

হল অর্থ বড়ো ঘর কিংবা রুম বিশেষ। যেমন: বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য আবাসিক হল থাকে।

আবার লাঙলের একটা প্রতিশব্দ হিসেবেও হল ব্যবহৃত হয়। দ্রবীকরণ ও সোনার প্রলেপ অর্থেও হল ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে ‘হলো’ হলো হওয়া অর্থে ক্রিয়ারূপ। যেমন: বিশেষ কারণে আমাকে এখান থেকে সরে যেতে হলো। আমার আর বেড়াতে যাওয়া হলো না। কিন্তু আমরা অনেকে ক্রিয়া হিসেবে ‘হলো’ এর জায়গায় ভুল করে ‘হল’ ব্যবহার করি। এখন থেকে সব সময় ক্রিয়া হিসেবে হলো ব্যবহার করবেন।

  • মত / মতো

মত অর্থ মনের ভাব, অভিমত, সম্মতি, সিদ্ধান্ত, পদ্ধতি কিংবা নিয়ম। যেমন: ১। এ ব্যাপারে তোমার মত কী? (অভিমত) ২। এ বিষয়ে আমার মত নেই। (সম্মতি) ৩। মত বদল করা ঠিক না। ( সিদ্ধান্ত) ৪। বিজ্ঞানের সূত্রমতে এটা অসম্ভব প্রায়। (পদ্ধতি) ৫। ধর্মমতে এ কাজ করলে কঠিন পাপ হয়! (নিয়ম)

অন্যদিকে মতো অর্থ হলো তুল্য বা সদৃশ। যেমন: আমি পাখির মতো উড়তে চাই। তাঁর মতো নরম মনের মানুষ আগে দেখিনি। আবার যোগ্য ও অনুযায়ী অর্থেও মতো ব্যবহৃত হয়। যেমন: ১। সারা পৃথিবী আমাকে অনেক দিন মনে রাখার মতো কাজ করে যেতে চাই। (যোগ্য) ২। নিয়মমতো কাজ করো, অন্যথায় মাশুন গুনতে হবে। (অনুযায়ী)

এ ছাড়া মতো, সদৃশ কিংবা তুল্য অর্থে মতন শব্দটিও ব্যবহৃত হয়।

আমাদের মধ্যে অনেককেই দেখা যায়, মতো এর জায়গায় মত ব্যবহার করতে! আশা করি, এখন থেকে মত, মতো আর মতন; এ তিনটাতে আর ভুল হবে না।

আরও পড়ুন: বিষাণ্ণিতা

  • কাল / কালো

কালো অর্থ কৃষ্ণ বর্ণ কিংবা শ্যাম বর্ণ। অবশ্য বিজ্ঞানের ভাষায় কালো কোনো রং নয়, বরং অন্যান্য রঙের অনুপস্থিতিই হলো কালো। যাই হোক, ভাষার আলোচনায় বিজ্ঞান ঢুকানো যাবে না! আমরা আঁধারের সাথে বিশেষণ হিসেবে কালো ব্যবহার করি, মাঝে মাঝে রাতের সাথেও! যেমন: নিকষ কালো আঁধারে/অন্ধকারে, এই কালোরাত্রি!

কিন্তু সমস্যা হলো অনেকেই এই কালো লেখার সময় ভুলে কিংবা অজ্ঞতাবশত ও কার না দিয়ে কাল লিখে ফেলে। তখন শব্দটা কিংবা পুরো বাক্যটার অর্থই বদলে যায়। কারণ কাল শব্দটা অনেকগুলো অর্থযুক্ত একটা সমৃদ্ধ শব্দ। কাল শব্দটার অর্থগুলো উদাহরণসমেত জানলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

কাল শব্দের অর্থগুলো হলো- ১। সময় বা ঋতু (গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, শীতকাল) ২। যুগ (একাল-সেকাল, অতীত কাল, ভবিষ্যৎ কাল) ৩। মানব জীবনের বিভিন্ন স্তর বা সময়ভাগ (শিশুকাল, কৈশোরকাল, যৌবনকাল, বৃদ্ধকাল) ৪। বিপদ-আপদ, অশুভ, মৃত্যু, ইত্যাদি (নতুন কেনা গাড়িটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল) ৫। পরবর্তী দিন বা আগামীদিন (তোমায় কাল আবার আসতে হবে) ৬। পূর্ববর্তী দিন বা আগেরদিন (সে কাল এখানে এসেছিল)

এ ছাড়া অতিশয় ঠান্ডা কিংবা হিমশীতল অর্থে আঞ্চলিক শব্দ হিসেবে কাল ব্যবহৃত হয়। [তবে প্রমিত বা চলিত ভাষায় এটার প্রচলন নেই।]

আশা করি, এখন থেকে কাল আর কালো বিভ্রাট আর হবে না।

প্রিয় পাঠক, আজকের বানান ক্লাস এই পর্যন্ত। এই লেখায় আমরা চারটি প্রচলিত বানান বিভ্রাট খোলাসা করার চেষ্টা করেছি। আশা করি, পরবর্তীতে আরও নতুন নতুন বানান নিয়ে হাজির হব! বানান ক্লাসের পরের লেখাটি সবার আগে পড়তে চোখ রাখুন গল্পীয়ান সাইটে। সবার আগে পোস্টের নোটিফিকেশন পেতে চাইলে- সাইটের নিচের দিকে থাকা ঘণ্টাটিতে চাপ দিয়ে বাজিয়ে দিন। ধন্যবাদ।

প্রচলিত বানান বিভ্রাট | © আবুল হাসনাত বাঁধন

 

তথ্যসূত্র:

  • বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান
  • প্রথম আলো ভাষারীতি
মন্তব্য করুন:
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন:

সম্পর্কিত পোস্ট