কবিসত্তা মরে গিয়েছে | ইসরাত জাহান জান্নাত

কবিসত্তা মরে গিয়েছে

কবিসত্তা মরে গিয়েছে | ইসরাত জাহান জান্নাত

অকালে মরে গেল আমার কবিসত্তা, এই নিয়ে অরির বেশ ক্ষোভ।
‘তোমার তো দিব্যি যশ পাওয়া বাকি,
কত ইনাম, কত বাহারি উপঢৌকন, বিলাতি পদক!
তার আগেই বলি হারি দিলে মেরে?’
অথচ, আমি ঘন অন্ধকারে তাকালে দেখি, আমার মৃত সই, ওটাই বড়ো ভয় অরির।
অরি জানে, এক জীবনে এই কবিতাটাই ছিল আমার বেঁচে থাকার সম্বল।

রোজ প্রভাতে নিয়ম করে প্রার্থনা করে,
দোয়া পড়ে, তসবিহ গুনে।
আমি ঠাঁই দেখি, দেখতেই থাকি, ওর জায়নামাজে নক্ষত্রের মতো উজ্জ্বল মুখ।

আমার বিমর্ষ মুখে ও বিড়বিড় করে ফুঁ দেয়।
যেন—
জীবন্ত হয় কবিতারা, বাঁচিয়ে তোলে আমাকে।
অথচ, আমার আর কবিসত্তা কখনো বেঁচে ওঠবে না।
আমি নির্বিঘ্নে বিষাদ ঘনিয়ে আরও এবং আরও তলিয়ে যাব,
যেখান থেকে এতটুকু কবিতা দেখা না যায়।

যখন আমি প্রথম কবিতা লিখেছিলাম, তখন আমি ষোড়শী।
হাতের তালুতে তখন যৌবনের ঘনঘটা, প্রেমই যেন সকল সুখ।
একসময় প্রেমে পড়লাম, চুটিয়ে প্রেমও করলাম, বিচ্ছেদও ঘটে গেল।
জন্ম নিলো কত কবিতা!
বিষাদের রেশ ধরেই জন্ম নিতো কবিতার ডাল-পালা কিংবা একটা আস্ত চারাগাছ।

অরি এলো জীবনে, কবিতাও কেমন যেন আস্তে আস্তে আমার সঙ্গ ছেড়ে গেল।
ওসব সুখটুক কিনা জানি নে, তবে আমি অতীতের যে বিষাদে কবিতা লিখতাম, ওই বিষাদ বড়ো ছেলেমানুষি।

বুঝেছিলাম—
যখন আমার হাত ভর্তি ওষুধ, প্রেসক্রিপশন, ইনজেকশন;
আমি ভোঁ দৌঁড়ে একটু অক্সিজেন খুঁজি।
সেই এক লকমা অক্সিজেনের অভাবে আমার বটবৃক্ষ হারিয়ে যায়।
যখন অর্থের অভাবে আমার অনাকাঙ্খিত ফুলটিকে কবর দিতে হয়।
যখন রোজ হেনস্তা কিংবা অপমানের পাল্লায় নুয়ে যায় শির।
যখন এক পেট খেয়ে দুই পেট হিসেব কষতে হয়।
বুঝেছিলাম, বিষাদ কাকে বলে? প্রেমহীন বিষাদই পৃথিবীর সেরা বিষাদ।

আমি হয়তো কবি নই, তাই বলতে পারি না—
‘ভাত দে হারামদাজা,
নাহলে মানচিত্র খাব!’
আমার বলতে হয়—
‘কবিসত্তা তুই মরে যা, ওসব পদক দিয়ে কিছু হবে না।
তুই বরং মরে যা। আমি বরং মানিয়ে নিই। মেয়ে মানুষ আবার এত ঠেলা কেন! মানিয়ে নিই।’

অরি হয়তো জানে, কিংবা জানে না—
‘কবিসত্তাও মানুষের মতো, ওই বটবৃক্ষের মতো, একবার মরে গেলে আর বেঁচে ফিরে না।’

কবিসত্তা মরে গিয়েছে | © ইসরাত জাহান জান্নাত

স্থান: পটিয়া, চট্টগ্রাম।

তারিখ: ২৩/০৬/২০২১

আরও পড়ুন: আলেয়া [প্রথম পর্ব] | ইসরাত জাহান জান্নাত

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: