তিথীর মৃত্যু | আরোহী হাসান

তিথীর মৃত্যু

তিথীর মৃত্যু

এক.

তিথীকে সন্ধ্যা ৭ টায় ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে আমি বাহিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আজ সারাদিন একবারও বাজারে যাওয়া হয়নি। সিগারেট আনতে হবে। মোবাইলে টাকা রিচার্জ করতে হবে। টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র আছে সেগুলো কিনতে হবে। এসমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে রাত ১০টায় যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন দূর থেকে কী যেন এক অদ্ভুত বস্তুকে শুয়ে থাকতে দেখি রাস্তার ধারে। অনেক দূর থেকে প্রথমে আঁচ করেছিলাম এটা হয়তো একটা পাগল টাগল মানুষ শুয়ে আছে। কিন্তু কিছুটা পথ সামনে এগিয়ে এসে দেখি এটা মানুষই ছিল তবে একটা লাশ। একটু সামনে এগুতেই দেখি চার পাঁচজন মানুষ কি যেন এক আতঙ্কিত উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লাশ’টার কিছুদূর সামনে! মানুষগুলো এলাকার বেশ বড়সড় ভদ্র ঘরের সন্তান। আমার ক্ষণিক অস্বস্তি বোধ হতে লাগল। এমন ভদ্র ঘরের সন্তানরা সাংঘাতিক একটা কাজ করতে পারে ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন যেন আতঙ্কিত করে তুলে।

কে জানে, যে ব্যক্তি লাশ হয়ে শুয়ে আছেন তিনি কে? কী তার পরিচয়? কেনই বা তাকে মারা হল! তাও আবার এমন নামীদামী পরিবারের সন্তানগুলো এই কাজ করেছে। সভ্যতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে আমাদের ভয়ংকর দৃষ্টি যা কেউ টেরই পায় না। কোথাও মারামারি হচ্ছে এমন একটা জায়গায়ও ভালোমন্দ দুরকম মানুষ দেখা যায়। কারও কারও মায়া লাগে। চিৎকার দিয়ে বলে, ‘তারে আর মারিস না।’ আবার কেউ কেউ চুপিচাপি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় এসে চোখে আঙুল দিয়ে আঘাত করে খুব শান্ত ভঙ্গিমায় হেঁটে চলে যাবে। যে মানুষটি এই কাণ্ড করে থাকে সমাজে তার পরিচিতি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং খুবই ভদ্র ও দানশীল। সে রাত হলে আকাশের তাঁরা গুনে। ভালোবাসার মানুষটির সাথে মোবাইল কানে দিয়ে আদুরে গলায় বলে, ‘তোমায় ছাড়া আমি বাঁচবোনা।’ পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ আর সবচেয়ে খারাপ মানুষ এই দুই ব্যক্তি কী করে, কোথায় থাকে? তা জানা গেলে ভালোই হতো। একদিন তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখে নিতাম ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

রাত ১০টায় আমি যখন বাসায় পৌঁছলাম তখনো দেখি তিথী হামাগুরি হয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়ে আছে। সিলিং ফ্যান সজোরে ঘুরছে। ফ্যানের আওয়াজ চারিদিক শনশন করে শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন ঝুম বৃষ্টি পড়ছে বাহিরে। আমি তিথীকে কয়েক বার ডাকলাম, ‘তিথী! তিথী! এই তিথী।’ কিন্তু তিথীর কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। প্রায় ভেবেই নিয়েছিলাম তিথী আমার উপর অভিমান করে জবাব দিচ্ছে না। তার অভিমান করার কোনো কারণ থাকে না। সামান্য একটু ভুল হলেই সে অভিমান করে বসবে। কোমল হাতে তিথীর মাথার উপর থেকে কম্বলটা আস্তে আস্তে করে সরালাম। দেখতে পেলাম তিথী চোখ মেলে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতাগুলো একটুও নড়াচড়া করছে না। সোনালি চুলে ঘেরা ধবধবে সুন্দর মুখটা রক্ত শূন্য ফ্যাকাশে হয়ে আছে। তার এমন অদ্ভুত কাণ্ড দেখে আমি মৃদু কণ্ঠে একটু হেসেছিলাম!

তিথী আমাকে ভয় দেখাচ্ছে তা ভেবে তার শরীরের উপর আবার কম্বল জড়িয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। সকালে ঘুম ভাঙার আগে উদ্ভট এক স্বপ্ন দেখি। কে যেন আমায় বলছে! ‘সেইদিন হয়তো অনেক বৃষ্টি হবে। তুমি কফিনের বাম পাশে বসিয়ো। একটু দেখে আবার চলে যেয়ো। খবরদার; আমার চুলে হাত দেবে না। আমার গায়ে হাত দেবে না। যদি দাও, তাহলে আমি খুব কষ্ট পাব।’

সকাল ১০টা বাজে তিথী তখনো ঘুম থেকে উঠেনি। তার রুমের সদর দরজা খুলে দেখি তিথী সেই সন্ধ্যায় যে ভঙ্গিমায় শুয়েছিল এখনো সেই ভঙ্গিমায় শুয়ে আছে। আমি একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। দারিদ্র্যের ছাপ প্রকট তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটা গা ছমছম করা পরিবেশ। কেন জানি আমার গায়ের সমস্ত পশম দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল তখন অনায়েসে। জানালার পর্দাগুলো টানা ছিল। সূর্যের আলো ঠিক মতো ঢুকছিল না রুমের ভিতর। আবছা আলো আবছা অন্ধকারে আলো আঁধারীরা খেলা করছিল পুরো রুম জুড়ে। কম্বলে ঢাকা একটা চারকোণা বিছানার উপর কাত হয়ে শুয়ে আছে তিথী। একটা হাত ভাঁজ করে রেখেছে মাথার নিছে। মুখ অদ্ভুত প্রশান্তি চোখ দুটো খোলা। জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সামান্য সূর্যের আলো পড়ছিল তার চোখে। সূর্যের আলোয় একটুও কাঁপল না চোখের পাতা দুটো। বুকের মাঝে কেমন যেন একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব পেলাম। রক্তশূন্য মুখটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম কী সর্বনাশ ঘটে গেছে! তবু হাত বাড়ালাম। যত্ন করে স্পর্শ করলাম তিথীর কপাল। বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। আর কোনো সন্দেহ নেই! তিথীর শেষ নিঃশ্বাস আমার অনুপস্থিতিতে চিরবিদায় নিয়েছে!

আমি একটু হেসেছিলাম! খুব হেসেছিলাম! অনেক হেসেছিলাম! অধিক শোকে পাথর হয়ে হেসেছিলাম! সে হাসি ছিল লণ্ডভণ্ড হাসি!

দুই.

তিথীর কফিনের বাম পাশে বসে আছি। চাকচিক্যময় কালো এক বাক্সে শুয়ে আছে তিথী নামক একটা লাশ। একদিন তিথীর কোনো নাম ছিল না, যেদিন সে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। আজ আবার নতুন এক নামে সম্বোধন পেয়েছে “লাশ”।

মনমনস্ক আমার নিতান্তই ক্ষীণ। মাঝেমাঝে হারিয়ে যাই সেই সুদূর অতীতে। যেদিন তিথীকে প্রথম দেখেছিলাম চকবাজারের সামনে সেইদিনই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। মুগ্ধতা ছিল তার চোখেও। সে চোখে অপলক হাসছে। হাসলে মানুষকে সুন্দর দেখায়। সবাই হাসতে পারে না। কেউ কেউ বা কিছু একটা লুকিয়ে হাসে। তবে সে হাসি আসল হাসি হতে হয়। হাসি সাধারণত নকল হয় না। যে হাসি নকল হয় সে হাসি ভয়ংকর খারাপ।

আমার কাছে প্রায় মনে হতো বিধাতা খুব যত্ন করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চোখ দুটো তিথীকে দিয়েছে। যে চোখের দিকে তাকালে অভিভূত হওয়া ছাড়া কোনো পথ নেই। দ্বিতীয়বার তিথীর সাথে দেখা হয় গোমতী নদীর ধারে। গোমতী নদীর ধারে বসে আমি অশ্রুমুখী নামক একটা বই পড়েছিলাম। সে থেকে এই নদীকে সম্বোধন দিয়েছি গোমতী থেকে অশ্রুমুখী। আমি প্রায় সময় সেখানে গিয়ে হাজির হই। তিথীও আসতো। ধীরেধীরে তার সাথে আমার পরিচয় হয়ে উঠে। কিন্তু তার আর আমার মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় “তন্ময়” নামক এক ভদ্র লোক। সে তিথীকে বিয়ে করে নেয়। তিথী হয়ে যায় তার স্ত্রী। অনুচ্চারিত রয়ে গেল আমার অন্তরের কথা। কতকিছুই না মানুষের বলা হয়ে উঠে না। আমারও হয়নি বলা অনেক কথা। আইনেস্টাইনের সূত্রে আমিও হয়তো ১৫-২০% প্রতিভা খরচ করতে পেরেছি আমার নিজের জন্য। সেজন্য বোধহয় অনুচ্চারিত রয়ে গেল। বাকি সব অতল সাগরে ডুব দিয়েছে।

বিয়ের তিন মাস পর তিথীর স্বামী ‘তন্ময়’ মারা যায়! বিয়ের আগে থেকেই তিথী নেশা করত। স্বামীর মৃত্যুর পর তার এই নেশার আসক্ত আরও বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকে! স্বামীর মৃত্যুর শোক মুছে যেতে পূর্বস্মৃতি জেগে উঠল আমাদের দু-জনের মনে। আবার সেই আগের মতো অশ্রুমুখী নদীর তীরে প্রতিদিন দেখা, আড্ডা, কথা, আরও কত কি। নতুন করে যেন টের পেলাম এই বুঝি আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি। রাত হলে দুজনে একসাথে আকাশ দেখতাম। জোছনাময় রাতে আকাশের বুকে তারাবিন্দু গুণতাম। তিথী অনেকটাই কাছে চলে আসে কিন্তু আমি ওর কাছে কখনোই যেতে পারতাম না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা একসাথে কাটিয়েছি অশ্রুমুখীর তীরে। কিন্তু “তোমাকে ভালোবাসি” এ কথাটা কখনোই বলে উঠতে পারিনি!

এ কিছু সময়ের মধ্যে তিথী আমাকে নেশায় অভ্যস্ত করে ফেলে। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে অশ্রুমুখীর তীরে গিয়ে হাজির হওয়া নৈয়মিক সন্ধ্যা বেলায়। নেশার অভ্যস্ততা ক্রমাগত আমার বাড়তেই থাকে। ব্যাপারটার মধ্যে দারুণ একটা রোমান্স ছিল। আমরা দুইজন একসাথে নেশা করতাম। খুব সুন্দর করে গুছিয়ে আয়োজন করে নেশা করতাম। নেশার কিছু নিয়ম কানুন আছে। নেশার সবকিছু চোখের সামনে রাখতে হয়। ভাগ্য ভালো থাকলে জিনিসপত্র সাজগোছ দেখেই নেশা হয়ে যায়। নেশা তো আর তেমন কিছু না মনের একটা বিশেষ ভাব মাত্র। সেই বিশেষ ভাব হুট করে উঠে না। এক পা, এক পা করে ধীরেধীরে উঠে।

আশ্চর্যের কথা তিথীর বিয়ের আগেও আমরা দুইজন একই জায়গা গিয়ে হাজির হতাম প্রতিদিন একই সময়ে। এই যে অতীতে ফিরে যাওয়া আমার মধ্যে একটা স্রেফ ঘোর কাজ করত। তিথী পুনর্জন্ম বিশ্বাস করত। আমি করতাম না। সে বলত এই পৃথিবীতে মৃত্যুর দুইশ বছর পড় আমাদের আবার দেখা হবে। আমরা পরস্পর আবার একত্রিত হবো। কিন্তু তার এই কথাগুলো বলত নেশার ঘোরের মধ্যে। নেশার ঘোরটা কাটত এক অদ্ভুত সময়ে। অশ্রুমুখীর তীরে নেশাগ্রস্থ অবস্থায় সে সন্ধান পেত এক পুরুষের আর আমি এক নারীর। তারা রাত জেগে জেগে গল্প করত। টেলিস্কোপ বিহীন তারা গুনত। চাঁদের বাম পাশের তাঁরাটি ছিল পুরুষ। আর ডান পাশের তারাটি নারী। ওরা দুইজনই দুইজন কে প্রচণ্ড ভালোবাসত। কিন্তু মাঝখানে দুস্তর বাধা। অনেক কষ্ট, অনেক ত্যাগ স্বীকার করার পর দুজন যখন মিলনের মুখোমুখি হবে ঠিক সে সময় কেটে যেত নেশা!

একদিন মিলনের মুখোমুখি, সে সময় নেশা কেটে গেল আমার। আমি আহাম্মকের মতন বসে রইলাম। কিন্তু তিথীর নেশা কাটল কিছুক্ষণ পর। বলল, সে নাকি দেখেছে আমাদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি কথাটার গুরুত্ব দিলাম না। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, সেইদিনের অবহেলায় কতখানি ব্যথা পেয়েছিল তিথী! তিথীর সে ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। বিধাতা সে ক্ষমতা আমায় দেয়নি।

সে থেকে তিথী আমার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি। চলে যায় কুষ্টিয়া। সেখানে গিয়ে আরও অতিরিক্ত নেশায় আসক্ত হতে থাকে। আমি কখনো সরাসরি নেশা করতে রাজি হইনি। তার সাথে থাকলেই আমাকে নেশা করতে হতো। কুষ্টিয়ায় তিথীর অতিরিক্ত নেশায় হৃৎরোগ আর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। তার এমন করুণ অবস্থা শুনে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসি। তাও বেশিদিন বাঁচাতে পারিনি। মৃত্যুর দুইদিন আগেও তিথী অতিরিক্ত নেশা করেছিল। তাকে বলেছিলাম, ‘নেশার ঘোরে তুমি কী দেখতে পেতে?’ সে খুব আয়োজন করে বলতো, ‘দেখতে পেতাম হাজার হাজার বছর আগের এক ছেলেকে। নানারকম স্বপ্ন কল্পে জড়িয়ে পড়তাম তাকে নিয়ে। আমরা দুজন এক সাথে রাত জাগতাম। ভোররাতে তারাগুলো কিভাবে নিদ্রায় যায় তা দেখতাম। সব শেষে যখন আমাদের বিয়ে হতে যাবে, ঠিক সে সময় ভেঙে যেত ঘোর।’

এদিকে রেডিওতে বলছে- ‘বিশিষ্ট শিল্পপতি, সমাজ সেবক জনাব রশিদ চৌধুরী গতকাল রাতে কান্দিরপাড়ে খুন হয়েছে। কারা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের তদন্ত অব্যাহত আছে। খুব শীঘ্রই এই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামীকে গ্রেপ্তার করা হবে।’হ্যাঁ, ওই যে রাত ১০ টায় বাসায় আসার সময় একটা লাশ দেখেছিলাম রাস্তার ধারে পড়ে আছে। চার পাঁচজন ভদ্র মানুষ দেখার পর আমি আর ওই লাশটার সামনে যাইনি। সে লোকটির নিউজ।

অতীতের ঘোর ভাঙলো আমার। সাদাকাপড় পরিধান করা তিথীর দেহখানি শুয়ে আছে অদ্ভুত এক চারকোণার চকিতে। রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখটা এক নজর দেখলাম। সেই অশ্রুমুখীর প্রতিনিয়ত দৃশ্য চেহারাখানি আজ চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। অথৈয়ে ভেসে যাচ্ছে চোখের জল। তিথী এখন আর তিথী নেই সে হয়ে আছে একটা লাশ! চারজনের চার কাঁধে করে তিথীকে নিয়ে যাচ্ছে এই নির্মম পৃথিবী থেকে।

তিথীর মৃত্যুর রাতের স্বপ্নখানির সাথে আজকের দিনটা কেমন যেন মিলে যাচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে দু চোখের পাতায়। আমি কফিনের বাম পাশে দীর্ঘক্ষণ বসে ছিলাম! বসে বসে অতীত ভেবেছি। বিদায়বেলা একটু দেখেই চিরতরে অদৃশ্য করে দিলাম তিথীকে! তার চুলে হাত দিইনি। গায়েও হাত দিইনি! দিলে, সে হয়তো খুব কষ্ট পাবে!

তিন.

প্রায় ১০ দিন পর আমি একা একা বসে আছি অশ্রুমুখীর তীরে। হিম বাতাস বইছে চারদিকে। ঐ দূর আকাশের তারাগুলো একে একে জ্বলে উঠছে।  নতুন একটি তারা যোগ হয়েছে চেপ্টে থালাটার এক কোণে। সে হলো তিথী। এই যেন আকাশের দিকে তাকালে তিথীও আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে যেন এখনি তিথী নেমে এসে বলবে, ‘তুমি কখনো পুনর্জন্ম বিশ্বাস করতে না। কিন্তু দেখবে হাজার বছর পড়ে আমাদের আবার দেখা হবে। হয়তো তুমি আর আমি আবার খুঁজে পাব নতুন এক অশ্রুমুখী। আর সেটা হবে বিন্দাবন।’

কৃষ্ণফুল ফুটে অশ্রুমুখীর জলে! আমি জানি; একটা ছেলে বিন্দাবনে কাঁদে! রাধাপদ্ম ফুটে ঐ দূর আকাশের তীরে! আমি জানি; একটা মেয়ে মধ্যরাতে আকাশের তারা হয়ে কাঁদে!

এই যেন তিথী আমার সামনে হতম্ভব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু একটা যেন আমাকে বলছে কিন্তু আমি শুনতে পারছি না। আমারও খুব ইচ্ছে করে তাকে অপ্রকাশিত কিছু কথা বলতে। তিথী তোমাকে গোপনে আমি অনেক ভালোবাসি। তুমি কখনো জানলে না। তোমাকে দেখলে আমার মন মস্তিষ্ক কেমন কেমন যেন করে। তোমাকে একটা কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে। একটা একটা করে অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে। তিথী তোমাকে ভেবে ভেবে আমার প্রায় রাত ঘুম আসে না। আমার কাছে প্রায় সময় মনে হয় তোমার কঠিন কোনো অসুখ হয়েছে। তুমি শুয়ে শুয়ে বিছানায় মৃত্যুর দিন গুনছ। আমি তোমার বিছানার সামনে বসে আছি। তুমি মুচকি হাসতে হাসতে বললে কতদিন অশ্রুমুখীর তীরে যাই না। কতদিন আড্ডায় বসি না।

ভাবতে ভাবতে আজও সেই অতীতের অস্তিত্বে ফিরে এলাম। অশ্রুমুখীর তীরে এখন আমাকে একাই আড্ডা দিতে হয় সেই অতীতের মতো। আজও আকাশে ‘তিথী’ নামক নতুন একটি তারা যোগ হয়েছে! টেলিস্কোপ লাগে না; অশ্রুমুখীর তীরে দাঁড়িয়ে একটু পূর্বদিকে তাকালেই সে তারা স্পষ্ট দেখা যায়! এইযে, এপ্রিলের আকাশটা কত ঘোলাটে! তবুও আকাশটাকে কত না সুন্দর দেখায় এপ্রিলের প্রতিটি মধ্যরাতে! কী ঝকঝকে নীল আকাশ! ছিন্নভিন্ন মাঝেমাঝে খণ্ড খণ্ড শ্যাওলা ধরা মেঘের অলিগলি ওই সুদূর নক্ষত্রমণ্ডলে! আজকাল তিথীর হয়তো সবচেয়ে বড় নেশা রাত জাগা! আর, সে নেশায় এখন ক্রমশই আসক্ত হচ্ছি আমি!

তিথীর মৃত্যু | আরোহী হাসান

 

আরও পড়ুন: অগল্প আগল্প ইগল্প

আরও পড়ুন: নিভৃত ভালোবাসা

[কীওয়ার্ডস:

তিথীর মৃত্যু | আরোহী হাসান

তিথীর মৃত্যু : আরোহী হাসান

তিথীর মৃত্যু – আরোহী হাসান

ছোটোগল্প | তিথীর মৃত্যু

আরোহী হাসানের ছোটোগল্প | তিথীর মৃত্যু

আরোহী হাসানের ছোটোগল্প : তিথীর মৃত্যু

আরোহী হাসানের ছোটোগল্প – তিথীর মৃত্যু

ছোটোগল্প | তিথীর মৃত্যু

ছোটোগল্প , গল্পোদ্যান , সমকালীন গল্প , জীবনধর্মী গল্প , রহস্য গল্প , ফিকশন , গল্পীয়ান]

 

মন্তব্য করুন:
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন: